দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

নওগাঁর বদলগাছীতে ভ্যান ছিনতাইয়ের অভিযোগে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে ধরে থানায় নেওয়ার পথে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এতে গুরুতর আহত ওই ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার পাহাড়পুর বাজারের থানার মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরদিন রোববার (১ নভেম্বর) সকালে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তার মৃত্যু হয়।
নিহত ব্যক্তির নাম হায়দার আলী (৫০)। তিনি জয়পুরহাটের ভাতশা ইউনিয়নের দেওনাহার গ্রামের মৃত কহির উদ্দিনের ছেলে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ অক্টোবর দুপুরে বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়নের বারাতৈল গ্রামের ভ্যানচালক সৌমিককে ৩০০ টাকা ভাড়ায় বদলগাছী নতুন ব্রিজ থেকে আক্কেলপুরে নিয়ে যান হায়দার আলীসহ কয়েকজন। সেখানে কৌশলে সৌমিককে দুপুরের খাবার খাওয়ানো হয়। একপর্যায়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়লে তাঁর চার্জার ভ্যানটি নিয়ে পালিয়ে যান তাঁরা।
এ ঘটনায় আক্কেলপুর মোড়ের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে আক্কেলপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন সৌমিকের পরিবারের সদস্যরা। পরে ওই ফুটেজে থাকা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
শনিবার ভ্যানের সন্ধানে সৌমিকের পরিবারের সদস্যরা বদলগাছী থানায় যান। সেখানে সিসিটিভি ফুটেজ দেখার সময় পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার এলাকা থেকে থানায় সেবা নিতে আসা কয়েকজন ব্যক্তি হায়দার আলীকে শনাক্ত করেন। তারা জানান, ওই ব্যক্তিকে কিছুক্ষণ আগে পাহাড়পুর মোড়ে দেখা গেছে। পরে সৌমিকের পরিবারের সদস্যরা পাহাড়পুর বাজারে গিয়ে তাঁকে শনাক্ত করেন।
এরপর হায়দার আলীকে ধরে একটি ভ্যানে করে বদলগাছী থানায় নিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁরা। থানার মোড়ে পৌঁছালে হায়দার আলী ভ্যান থেকে লাফ দিয়ে হাটের ভেতর পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় সৌমিকের বাবা সামছদ্দিন ‘চোর পালাচ্ছে’ বলে চিৎকার দেন। এরপর বাজারে উপস্থিত লোকজন তাকে মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁকে মাইক্রোস্ট্যান্ডের একটি চৌকিতে বসানো হলেও সেখানেও আবার মারধর করা হয়।
গুরুতর আহত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে সৌমিকের পরিবারের সদস্যরা তাঁকে পুলিশের কাছে নিয়ে যান। পরে তাঁকে বদলগাছী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে পুলিশের সহযোগিতায় জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। শনিবার রাত ১০টার দিকে তাকে সেখানে ভর্তি করা হয়। পরদিন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
হায়দার আলীর মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বদলগাছীতে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ ঘটনায় কারা তাঁকে মারধর করেছেন এবং কী পরিস্থিতিতে তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার বিষয়ে জানতে রোববার বারাতৈল গ্রামে সৌমিকের বাড়িতে গেলে পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে সৌমিক, তার বাবা সামছদ্দিন ও মা শিল্পীর সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানান, ভ্যান হারানোর পর থানায় গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করেন। পরে পাহাড়পুর বাজার থেকে তাঁকে ধরে থানায় নেওয়ার সময় তিনি পালানোর চেষ্টা করেন।
সামছদ্দিন বলেন, ‘চোর পালাচ্ছে’ বলে চিৎকার দিলে হাটের লোকজন তাঁকে মারধর করেন। আমরা তাঁকে মারিনি। হাটের অনেক লোক তাঁকে মারধর করেছে। তাঁদের কাউকে আমরা চিনি না। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে থানা-পুলিশ এবং যুবদল নেতা মুমিনুল ইসলাম মুন্না, আকরাম ও রাইহানের সহযোগিতায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করাই। পরদিন সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর পাই।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বদলগাছী মাইক্রোস্ট্যান্ডের চালক সাদ্দাম হোসেন বলেন, সেদিন হাটবার ছিল। হায়দার আলীকে চোর হিসেবে শনাক্ত করার পর বাজারে উপস্থিত লোকজন তাঁকে মারধর করেন। পরিচিত কাউকে মারধরে অংশ নিতে দেখেননি তিনি। তাঁর ভাষ্য, বাজার করতে আসা লোকজনই মারধরে অংশ নেন।
বদলগাছী বালুভরা যুবদলের নেতা আকরাম ও রাইহান বলেন, শনিবার থানার পাশের একটি কমিউনিটি সেন্টারে তাঁদের কর্মিসভা চলছিল। মারধরের খবর পেয়ে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে মাইক্রোস্ট্যান্ডে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন তাঁরা। পরে থানা-পুলিশের সহযোগিতায় আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। আক্কেলপুর থানায় জিডি থাকায় সেখানে চিকিৎসা না পেয়ে তাঁকে আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয় বলে তাঁরা জানান।
আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে দায়িত্বে থাকা উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নাজমুল হক বলেন, শনিবার রাতে গুরুতর আহত অবস্থায় হায়দার আলীকে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধরের গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
আক্কেলপুর থানার পরিদর্শক মেহেদী হমাসুদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ভ্যান ছিনতাইয়ের ঘটনায় সৌমিকের পরিবার থানায় জিডি করেছিল। পরে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে হায়দার আলীকে শনাক্ত করেন তাঁরা। থানায় নেওয়ার সময় তিনি পালানোর চেষ্টা করলে উপস্থিত জনতা তাঁকে মারধর করে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
বদলগাছী থানার পরিদর্শক হাবিবুর রহমান বলেন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় হায়দার আলীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে নিহত হায়দার আলীর ভাতিজা পুলিশ সদস্য সবুজ হোসেন দাবি করেন, তাঁর চাচা আগে কখনো চুরি বা ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাঁর পরিবারে কেউ নেই। তিনি ভবঘুরে প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তাঁকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে। বর্তমানে তাঁর মরদেহ জয়পুরহাট সদর হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। ময়নাতদন্তের পর এ ঘটনায় বদলগাছী থানায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ভ্যান ছিনতাইয়ের অভিযোগে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করার পর হায়দার আলীকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে কেন তিনি গণপিটুনির শিকার হলেন, তা নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে কারা তাঁকে মারধর করেছেন এবং কীভাবে তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
যে আই